জেলা প্রশাসন
left_menu_pic
Joomla Slide Menu by DART Creations
left_menu_footer
জেলা প্রশাসনের পটভূমি

জেলা প্রশাসনের পটভূমি

পটভূমি ডাউনলোড করার জন্য এখানে Click করুন।


মুগল সম্রাট আকবর রাজস্ব প্রশাসনের সুবিধার্থে সাম্রাজ্যকে কয়েকটি সুবায় (প্রদেশ) বিভক্ত করেন। প্রত্যেক সুবাকে কয়েকটি সরকার এবং পরগণায় বিভক্ত করেন, যা বতর্মান জেলার সাথে অনেকটা সামঞ্জস্য। এসব বিভাজন কালক্রমে  প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে পরিগণিত হয়। প্রত্যেক সুবার দায়িত্বে ছিন একজন সুবেদার (গভরনর) এবং তা শক্তিশালী প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে বিবেচিত ছিল। কিন্তু পরগণা (জেলা) প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে সেভাবে বিবেচিত ছিল না।


বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এদেশে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে আসে এবং কালক্রমে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা গ্রহণ  করে ঔপনিবেশিক আমলে বিভাগ, জেলা ও থানাকে প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে সৃষ্টি করে। বৃটিশ ইষ্টি ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৭১ খ্রিষ্টাব্দে াংলা, িহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানী লাভ করে। ভারতের গভরনর জেনারেল ওয়ারেন হিস্টিংস ১৭৭২ খ্রিষ্টাব্দে ংগ প্রদেশকে ২৩টি জেলায় িভক্ত করেন। প্রতি জেলায় রাজস্ আদায় ও রাজ্স্ সংক্রান্ত দেওয়ানী মামলার শুনানী গ্রহণের জন্য একজন স্থানীয় দেওয়ান সাহায্য করতেন। কিন্তু কালেক্টরের তত্ত্ববধানে ফৌজদারী মামলার বিচারকার্য পরিচালনা করতেন স্থানীয় মুফতি ও কাজী। দু’টো ভিন্ন নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের অধীনে কালেক্টর এরূপ দ্বিমুখী কার্যাবলী পরিচালনা করতেন। অর্থাৎ রাজস্ব সংক্রান্ত বিষয়ে কালেক্টরগণ, গর্ভণর জেনারেল ও পরিষদের অধীনে এবং বিচার সংক্রান্ত বিষয়ে কলিকাতার গর্ভণর জেনারেলের সভাপতিত্বে সদর দেওয়ানী আদালতের অধীন ছিলেন। দেওয়ানগণের র্কাযাবলির তদারক ও কালেক্টরগণের প্রদত্ত দেওয়ানী মামলার রায়ের বিরুদ্ধে আপীল শ্রবণের জন্য ৬টি প্রাদেশিক আদালত ছিল। তদুপরি ওয়ারেন হেস্টিংস জমিদারগণের অধীন পুলিশ বাহিনী গঠন করেন। লড কর্ণওয়ালিশ পুলিশ বাহিনীকে জমিদারদের অধীন থেকে সরাসরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং থানা এলাকা চিহ্নিত করার ব্যবস্থা করেন। প্রত্যেক থানায় পুলিশ বাহিনীর প্রধান হিসেবে একজন পরিদর্শক নিয়োগের ব্যবস্থা করেন। সর্ব প্রথম ১৭৭৯ খ্রিষ্টাব্দে পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে পুলিশ বাহিনীকে সংগঠিত করে কালেক্টরের নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। ১৭৮১ খ্রিষ্টাব্দে ১৮ জন কালেক্টরকে পোস্টিং দেয়া হয়। তাদেরকে রাজস্ব আদায় এবং আদালত তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দেয়া হয়।


বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বোর্ড অব ডাইরেক্টরস ১৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে দেশীয় দেওয়ানের পদ বিলোপ করে কালেক্টরকে স্থানীয় প্রশাসনের স্থায়ী ইউনিট করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং রাজস্ব প্রশাসন, সিভিল জজ ও ম্যাজিস্ট্রেট প্রভৃতি অফিসকে কালেক্টরের অফিসের সাথে সম্পৃক্ত করার জন্য সুপ্রীম কাউন্সিলকে নির্দেশ প্রদান করে। উক্ত আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে, মেকপারসন ১৭৮৬ খ্রিষ্টাব্দে বংগ প্রদেশকে ৩৬টি জেলায় বিভক্ত করে প্রত্যেক জেলায় একজন কালেক্টর নিয়োগ করেন। ১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দে কালেক্টরকে আইন-শৃংখলা রক্ষার দায়িত্ব, ম্যাজিষ্ট্রেসী ক্ষমতা প্রদান ও রাজস্ব আদায়ের সার্বিক দায়িত্ব দেয়া হয়। পরবর্তীতে প্রশাসন থেকে বিচার বিভাগকে পৃথক করা হয় এবং একজন জজের অধীনে নেয়া হয়। রাজস্ব বোর্ড বিলোপের মাধ্যমে কালেক্টরের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপীল শ্রবণের জন্য চারটি সার্কিট কোর্ট গঠন করা হয়। ১৮২৯ খ্রিষ্টাব্দ থেকে বিভাগীয় কমিশনার এসব সার্কিট কোর্টের স্থলাভিষিক্ত হন এবং ১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বিভাগীয় কমিশনার দেওয়ানী, ফৌজদারী ও রাজস্ব বিষয়ক মামলার আপীল শ্রবণ করতেন। ১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ ক্রাউন, ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি থেকে ভারত শাসনের ক্ষমতা নিজ হাতে নেবার পর ভূমি রাজস্ব, প্রজাস্বত্ব, দন্ডবিধি, ফৌজদারী কার্যবিধি ইত্যাদির ক্ষেত্রে আইন পাশ করে। ফলে কালেক্টরের কতিপয় প্রশাসনিক ও ডিসক্রিশানারী ক্ষমতা কমে যায়, যদিও কালেক্টরেকে রাজস্ব আদায় ও জেলার আইন শৃংখলার সার্বিক দায়িত্ব দেয়া হয়। ১৮৬৯ খ্রিষ্টাব্দে কালেক্টরকে ফৌজাদারী বিচার নিষ্পত্তির ক্ষমতা অর্পণের মাধ্যমে ‘‘ম্যাজিস্ট্রেসী’’ নামকরণ করা হয় এবং জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ করা হয়। জেলা জজ এর আদালতকে ‘দায়রা আদালত’ এবং কলিকাতার দেওয়ানী আদালতকে ‘আপীল আদালত’ হিসেবে নামকরণ করা হয়। বিভাগীয় কমিশনারকে রাজস্ব মোকদ্দমার ক্ষেত্রে আপীল আদালত হিসেবে রাখা হয়। কালক্রমে জেলা পর্যায়ের অন্যান্যা বিভাগীয় অফিস সৃষ্টি করা হয়।


১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দে স্যার জর্জ ক্যামবেল, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এর ক্ষমতাকে আরও সুদৃঢ় করেন। এ সময় জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টরেকে জেলা পর্যায়ে অন্যান্য বিভাগীয় অফিসের কাজকর্মের তত্ত্বাবধানের ক্ষমতা প্রদান করার মাধ্যমে তাঁকে জেলা পর্যায়ের প্রধান নির্বাহী ও প্রশাসক হিসেবে গড়ে তোলা হয়। মন্টোগো চেমস ফোর্ড ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে সর্ব প্রথম জেলা পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধির সমন্বয়ে একটি লেজিসলেটিভ কাউন্সিল গঠনের বিধান করেন। এতে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এর ক্ষমতা ও প্রভাব বহুলাংশে কমে যায়, যদিও তাঁকে রাজস্ব আদায় ও ম্যাজিস্ট্রেট এবং পুলিশের উপর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা প্রদানের মাধ্যমে আইন-শৃংখলার দায়িত্ব দেয়া হয়। এছাড়াও তাঁকে জেলা পরিষদ সহ স্থানীয় প্রতিষ্ঠান সমূহ পরিদর্শন এবং এতদসংক্রান্ত প্রতিবেদন কর্তৃপক্ষের নিকট প্রেরণের ক্ষমতা দেয়া হয়। ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে সাইমন কমিশন মত প্রকাশ করে যে, কালেক্টর, জেলা প্রশাসনের প্রধান হিসেবে পুলিশ সুপার ও অন্যান্য কারিগরি বিভাগের প্রধানগণের ওপরে থাকবেন। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তান সৃষ্টি হবার পর থেকে সমগ্র দেশকে বিভাগ, জেলা ও মহকুমা এবং থানা পর্যায়ে প্রশাসনিক ইউনিটে রুপান্তর করা হয়। এ সময় জেলা প্রশাসন শক্তিশালী ইউনিট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। কালেক্টর/ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট/ ডেপুটি কমিশনার জেলার প্রধান নির্বাহী হিসেবে পুলিশ সুপার ও অন্যান্য কর্মকর্তার উপর তদারকী ও সমন্বয়মূলক ভূমিকা পালন করে আসছেন।


স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশ বিভাগ, জেলা, মহকুমা ও থানা প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে বহাল থাকে এবং জেলা প্রশাসন শক্তিশালী ইউনিট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। জেলা প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট/ কালেক্টর/ জেলা প্রশাসক জেলার রাজস্ব আদায়, আইন শৃংখলার সার্বিক দায়িত্ব ও ফৌজাদারী বিচার প্রশাসনসহ আন্তঃবিভাগীয় কাজের সমন্বয় সাধন করেন। যদিও ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে ডেপুটি কমিশনার/ কালেক্টর/ জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের পুলিশ সুপার সহ অন্যান্য বিভাগীয় কর্মকর্তাগণের এসিআর লিখন এবং সমন্বয়মূলক ক্ষমতা খর্ব করা হয়, তথাপিও পরবর্তীতে ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দে জাতীয় প্রয়োজনে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এ প্রতিষ্ঠানকে পুনারায় আন্তঃবিভাগীয় কাজ-কর্মের সমন্বয়ের ক্ষমতা প্রদান করা হয়। বর্তমানে জেলা প্রশাসক প্রশাসন, রাজস্ব প্রশাসন, ফৌজদারী বিচার প্রশাসন, আইন-শৃংখলা রক্ষা, উন্নয়ন প্রশাসন ছাড়াও জেলা পর্যায়ের আন্তঃবিভাগীয় কাজের সমন্বয় সাধনের মত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে সমাদৃত।